গাঁজা

Spread the love

গাঁজা (Cannabis) মূলত সপুষ্পক উদ্ভিদের গণ। গাঁজা মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি। যেখানে সাতিভা গাঁজা, ইন্ডিকা গাঁজা এবং রুডের্লাইস গাঁজা, এই তিনটি ভিন্ন প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গাঁজা দীর্ঘকাল ধরে বীজ ও বীজ তেল, ঔষধি উদ্দেশ্যে এবং একটি বিনোদনমূলক ড্রাগ হিসাবে শণ আঁশের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

গাঁজা (ঔষধ)
গাঁজা, সাধারণত মারিজুয়ানা, গঞ্জিকা, গাঞ্জা, সিদ্ধি, সব্জি, গ্রাস, মাজুন ইত্যাদি নামে পরিচিত। মূলত গাঁজা উদ্ভিদের এক ধরণের প্রস্তুতি যা সাইকোঅ্যাক্টিভ ড্রাগ এবং ঔষধ হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়। ফার্মাকোলজিক্যালি, গাঁজার প্রধান সাইকোঅ্যাক্টিভ উপাদান হল টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (টিএইচসি); এটি উদ্ভিদের ৪৮৩টি পরিচিত যৌগের ১টি এছাড়াও ৮৪টি অন্যান্য ক্যানাবিনোয়েড্স রয়েছে, যেমন ক্যানাবিডিওল (সিবিডি), ক্যানাবিনল (সিবিএন), টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিভারিন (টিএইচসিভি) এবং ক্যানাবিগেরো (সিবিজি)। গাঁজা সাধারণত ধূমপান, বাষ্পীকরণ, খাবারের মধ্যে মিশ্রণ, এবং নির্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

গাঁজা প্রায়ই এর সাইকোঅ্যাক্টিভ এবং শারীরবৃত্তীয় প্রভাবের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন একটি “উচ্চ” বা “ভেলকা” অনুভূতি হিসাবে, সাধারণ উপলব্ধি পরিবর্তন, রমরমা (উচ্চমানের মেজাজ), এবং এবং ক্ষুধা বৃদ্ধি করে। ধূমপানের মাধ্যমে সেবনে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রভাবগুলির সূচনা হয়, অন্যদিকে রান্না করে খাওয়া হলে প্রায় ৩০ থেকে ৬০ মিনিট এর প্রভাব উপলব্ধ করা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পাঁচ-ছয় ঘন্টা স্থায়ী হতে পারে। সম্ভাব্য স্বল্পমেয়াদী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি হ্রাস, মুখগহ্বরে শুষ্কতা, অনভিজ্ঞের মতোন আচরণ করা, চোখ লাল হওয়া, এবং প্যারানয়া (মস্তিষ্কবিকৃতিবিশেষ) বা উদ্বেগ অনুভূতি হওয়া। সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে, মানসিক ক্ষমতা হ্রাস- যারা তের থেকে ঊনিশ বছর বয়সে সেবন শুরু করেছে, এবং শিশুদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা দেখা দেয় যাদের মা গর্ভাবস্থায় গাঁজা সেবন করেন। গবেষণায় গাঁজা ব্যবহার এবং মানসিক রোগের ঝুঁকি বিষয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে; যদিও কর্যিকারণ এবং প্রভাব সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে।

আধুনিককালে গাঁজা বিনোদনমূলক বা চিকিৎসার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। প্রাথমিককালে ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবেও খ্রিষ্টপূর্ব ৩ হাজার বছর পূর্বে এর ব্যবহার হত। ২০১৩ সালের হিসেবে, ১২৮ এবং ২৩২ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে গাঁজার ব্যবহার অনুমান করা যায় (বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার ১৫ এবং ৬৫ বছরের মধ্যে ২.৭% থেকে ৪.৯%)। ২০১৫ সালের হিসেবে, ৪৬% মার্কিনী গাঁজা ব্যবহার করে, যা ২০১৬ সালে ৫১% বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ১২% বিগত বছরের মধ্যে এর ব্যবহার করেছেন, এবং ৭.৩% বিগত মাসে এর ব্যবহার করেন। বিশ্বের এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উভয় ক্ষেত্রেই এটি সর্বাধিক ব্যবহৃত অবৈধ ড্রাগ।

প্রাথমিকভাবে ৩য় সহস্রাব্দের বিসি থেকে গাঁজার ব্যবহার সম্পর্কে জানা যায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে থেকে, গাঁজা আইনি সীমাবদ্ধতার বিষয় হয়ে ওঠে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই গাঁজার মালিকানা, ব্যবহার, এবং বিক্রয় অবৈধ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মারিজুয়ানা বা গাঁজা মূলত চিকিৎসক-প্রস্তাবিত ভেষজ থেরাপি হিসাবে গাঁজা উদ্ভিদের ব্যবহার বোঝায়, যা ইতোমধ্যে কানাডা, বেলজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ড, স্পেন, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩২টি রাজ্যে স্থান করে নিয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গাঁজার ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনীকরণের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিনোদনমূলক বা চিকিৎসা সেবার জন্য গাঁজার বৈধকরণ করা হয়েছে।

প্রভাব
গাঁজার সেবনের সাইকোঅ্যাক্টিভ এবং শারীরবৃত্তীয় নানান প্রভাব রয়েছে। গাঁজার তাৎক্ষণিক গ্রাসকারী প্রভাবের মধ্যে শিথিলায়ন এবং হালকা রমরমা মেজাজ অন্তর্ভুক্ত (“উচ্চ” বা “স্টোন্ড” অনুভূতি), কিছু তাৎক্ষণিক অবাঞ্ছিত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি হ্রাস, মুখগহ্বর শুষ্কতা, অনভিজ্ঞ করে তোলা, চোখ লাল হওয়া প্রভৃতি। পাশাপাশি বোধ এবং মেজাজ বা মানসিক অবস্থার বিষয়ী পরিবর্তন, সর্বাধিক সাধারণ স্বল্পমেয়াদী শারীরিক ও স্নায়বিক প্রভাবের মধ্যে হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, ক্ষুধা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ, নিম্ম রক্তচাপ, স্বল্পমেয়াদী এবং কর্ম স্তৃতির অবনতি, মানসিক সমন্বয় এবং একাগ্রতা অর্ন্তভূক্ত।

প্রস্তুতি
মারিজুয়ানা
মারিজুয়ানা বলতে শুকনো ফুল এবং স্ত্রী গাঁজা উদ্ভিদের কচি পাতা ও ডালপালাকে বুঝায়। এটি গাঁজার সর্বাধিক প্রচলিত ধরণ যার মাঝে টিএইচসি এর পরিমাণ থাকে ৩%-২০% এছাড়াও সর্বোচ্চ ৩৩% টিএইচসি ও অনেক ধরনের মাঝে পাওয়া যায়। এছাড়াও, বিভিন্ন জাতের মিশ্রণ ঘটিয়ে গাঁজার শিল্প উৎপাদন করা হয় যেখানে টিএইচসি এর পরিমাণ থাকে ১% এবং এ কারনে এটি বিনোদনমূলক ব্যবহারের অনুপযোগী।

কিফ
কিফ ট্রাইকোম সমৃদ্ধ একধরণের গুঁড়া, যা গাঁজা গাছের ফুল ও পাতা থেকে সংগ্রহ করা যায় এবং একে গুঁড়া অবস্থায় সেবন বা হ্যাশিশ কেক উৎপাদনের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। “কিফ” শব্দটি চলিত আরবি كيف kēf/kīf থেকে এসেছে, যার অর্থ পরিতোষ বা সন্তুষ্টি বোঝায়।

হাশিশ
হাশিশ (এছাড়াও হাশীশ, হাশিশা, বা কেবল হ্যাশ নামে পরিচিত) একধরণের ঘনীভূত রজন কেক বা বল বিশেষ যা, গাঁজার ফুল এবং পাতা থেকে নিঃসৃত ট্রিকহোম এবং উত্তম উপাদানসমন্বিত কিফ থেকে চিপে উৎপাদন করা হয়। এটি খাওয়া কিংবা ধোঁয়া হিসেবে পান করা হয়।

টিঙ্কচার

হ্যাশ তেল
হ্যাশ তেল গাঁজা উদ্ভিদ থেকে দ্রাবক নিষ্কাশনের মাধমে পাওয়া যায়।

আধান
অনুদ্বায়ী দ্রাবক ব্যবহৃত গাঁজার আধান আরোপের বিভিন্ন ধরন রয়েছে।

বিমিশ্র গাঁজা
দূষণকারী মূলত “সাবান বার” ধরনের উৎস থেকে প্রাপ্ত হাশিশ থেকে পাওয়া যেতে পারে।

ব্যবহার পদ্ধতি
গাঁজা বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করা হয় যেমন ধূমপান, বাষ্পীভূত, গাঁজার চা ও এডিবল।

গাঁজার ভেষজ গুণ নিয়ে ২৭৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম লেখেন চিনা সম্রাট শেন্ নুং। তাঁর মতে, বাতের ব্যথা ও ম্যালেরিয়া সারাতে, আর একাগ্রতা বাড়াতে, গাঁজার তুলনা নেই।

আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আশেপাশে লেখা অথর্ব বেদ, ভাং-কে স্বীকৃতি দিয়েছে পবিত্র ঘাস হিসেবে। আর শিবঠাকুরের প্রিয় নেশা বলে তা তাঁকে নিবেদনের কথাও লিখেছে। আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দেখা যাচ্ছে মধ্য এশীয় স্কাইথিয়ান গোষ্ঠীকে। তারা শণের পোশাক ও দড়ি ব্যবহার করত। এর পরেই এদের হাতে পৌঁছায় এই ক্যানাবিস প্রজাতির শণ। সেখান থেকে শুধু দড়ি বা পোশাকই বানানো যায় না, নেশাও চমৎকার হয়। গাঁজা যেহেতু আদতে পাহাড়ি, অনুমান করা হয়, হিমালয়ের রাস্তা দিয়েই সে চলতে শুরু করে পশ্চিমের দিকে।

পঞ্চম খ্রিস্টপূর্বাব্দে, গ্রিক দার্শনিক হেরোডোটাস তাঁর লেখায় স্কাইথিয়ানদের গাঁজা টানার কথা উল্লেখ করেছেন, আর তার দুশো বছরের মধ্যেই গ্রিকরাও গাঁজা, আর সেই শণের তৈরি পোশাক পরায় অভ্যস্ত হয়ে উঠল। আর গ্রিসে যদি একটা কিছু এসে পড়ে, তা আর রোমে পৌঁছতে কত ক্ষণ? প্রথম শতাব্দীতে প্লিনি-র লেখাতেই তাই শণের দড়ি আর গাঁজা দুইয়েরই উল্লেখ পাই।

তখন মানুষ বাণিজ্য করেই খায়। জাহাজ কিংবা নৌকোর ওপর নির্ভরশীল তারা। সে যুগ দড়ি ছাড়া অচল। সুতির কাপড় সবার সাধ্যে কুলোয় না। শণের দড়ি আর পোশাকের ব্যবহার সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল সে সময়। পৌঁছে গেল মহাসাগরের অপর পাড়ে নতুন বিশ্বেও। আর এই শণ কেনার সঙ্গে যদি নেশার জিনিসও মুফতে জুটে যায়, তা হলে তো কেল্লা ফতে! তাই এই বিশেষ শণ আর গাঁজা সারা পৃথিবীতেই খুব কদর পেল।

পরে, পাটের দড়ি তৈরি হতে শুরু হল, সুতোও খুব সহজে পাওয়া যেত। তাই রাশ টানা হল গাঁজা চাষে। তবু বিশ্বের বহু জায়গায় লুকিয়ে এর চাষ চলতেই থাকল। আর আজ তো আমেরিকার কিছু প্রদেশ সরকারি ভাবে গাঁজা চাষকে স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে!

আমাদের দেশে গাঁজা টানার সঙ্গে ধর্ম-কর্ম মিলেমিশে একাকার। শঙ্কর নাথ রায় থেকে শিবপ্রসাদ ভারতী— সবার লেখাতেই সাধু-সন্ন্যাসীদের সেই ‘তুরীয় আনন্দ’-এর কথা আছে। অমরনাথ-কেদারনাথে কৌপীনধারী বাবারা দিনের পর দিন বুঁদ থাকেন গাঁজার ধোঁয়ায়।

বাউলরাও গাঁজাকে বড়ই আদর-ইজ্জত দেন। বৈষ্ণবদের শ্মশানের বড় কলকেতে মৌজ আসে না, তাঁরা ভালবাসেন ছোট কলকে। ওঁরা তাকে ডাকেন ‘বাঁশি’। গাঁজা কাটার ছুরি ‘রতনকাটারি’, যে কাঠের টুকরোর ওপর রেখে গাঁজা কুচানো হয়, তা ‘প্রেম তক্তি’, আর কলকের তলায় জড়ানো কাপড়ের টুকরো হল ‘সাফি’।

বাছাই করা সিদ্ধি গাছের কালচে-বাদামি রঙের ফুলের আঠা জমিয়ে তাল পাকিয়ে তৈরি হয় ‘হাশিশ’। ক্রুসেডের সময়ে নাকি কিছু লোক, অন্য ধর্মাবলম্বীদের গুপ্তহত্যা করতে যেত! আর যাওয়ার আগে, অনেকটা করে হাশিশ খেয়ে নিত! পশ্চিম এশিয়ার এই লোকদের, আরবি ভাষায়, ‘হাশিশিন’ বা হাশিশখোর বলা হত। আর সেখান থেকেই নাকি ইংরেজি শব্দ ‘অ্যাসাসিন’-এর সৃষ্টি!

আপনার মতমত দিন

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *