বরিশালের যত নদী

Spread the love

সাধারণত স্বাদু পানির একটি প্রাকৃতিক জলধারা যা ঝরনাধারা, বরফগলিত স্রোত অথবা প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়ে প্রবাহ শেষে সাগর, মহাসাগর, হ্রদ বা অন্য কোন নদী বা জলাশয়ে পতিত হয় । নদীকে তার গঠন অনুযায়ী শাখানদী, উপনদী, প্রধান নদী, নদ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা যায়। আবার ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে ছোট নদীকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রাচীন বাংলার অনেক শহর।

বরিশাল

বাংলাদেশের যে-সব ভূখণ্ড সৃষ্টিতে নদ-নদীর অবদান এককভাবে স্বীকৃত, বৃহত্তর বরিশাল নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অন্যতম। সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এখানকার নদীগুলোর জালের মতো ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য শাখা-প্রশাখা প্রতিনিয়ত পলি বহন করে সৃষ্টি করে চলেছে অপরূপ এই ভূখণ্ডটিকে।

বিখ্যাত নদীসমূহ
মেঘনা: বরিশালের সর্ববৃহৎ নদীটি হলো মেঘনা। জন্মলগ্ন থেকে চলার পথে এই প্রমত্তা নদী দুই কূলের অসংখ্য স্থানের ভূখণ্ড গ্রাস করে নিয়েছে বলে এর বরিশাল অংশের তীরে কোনো উল্লেখযোগ্য জনপদ গড়ে ওঠেনি।

সুগন্ধা– মিশরকে যেমন নীলনদের দান বলা হয় তেমনি বরিশালকে সুগন্ধার দান বলা যেতে পারে। রামায়ণে গঙ্গার পূর্বগামী তিনটি শাখার নাম রয়েছে। তারা হলো হলদিনী, পাবনী ও নলিনী। গঙ্গার পূর্বগামী এ তিন ধারার মোহনার নাম ছিল সুগন্ধা। এই মোহনায় ধীরে ধীরে উদ্ভূত স্থলভাগই চন্দ্রদ্বীপ, যা বর্তমানে বরিশাল হিসেবে পরিচিত। প্রাগৈতিহাসিক সেই সুগন্ধার ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় প্রায় অসম্ভব।

চন্দ্রদ্বীপের প্রাচীন নদী সুগন্ধার সাথে হিন্দু পুরাণের একটি উপাখ্যান সংযোগ রয়েছে। কথিত আছে, সতীর দেহ নিয়ে শিব যখন শোকোন্মাদ হয় তখন তাতে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। এ দেখে মহাভাগ বিষ্ণুর চক্র দ্বারা তারার দেহ একান্ন খন্ডে বিভক্ত করে এবং সে খন্ডগুলো যে যে স্থানে পতিত হয়েছে সে স্থানগুলো তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। পাবনী, হলদিনী ও নলিনীর মিলিত মোহনায় তারা সতী দেবীর নাসিকা পড়েছিল। সেজন্য ত্রিধারার মোহনার নাম সুগন্ধা হয়েছে। নাসিকা দিয়ে সুঘ্রাণ নেয়া হয়, তাই সুগন্ধা নাম।

কালিকা পুরাণে সুগন্ধার উল্লেখ আছে- “সুগন্ধায়াং নাসিকা মেদেব স্ত্র্যম্বক ভৈরব।/ সুন্দরীসা মহাদেবী সুনন্দাতত্রৎ দেবতা” -কালিকাপুরাণ সুগন্ধা নদীর পলিমাটি থেকে জেলার ভূগঠন হয়েছে। সুগন্ধার পূর্ব পারে ছিল বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ এবং পশ্চিম পারে ছিল সেলিমাবাদ। সুগন্ধার সংক্ষিপ্ত নাম সন্ধ্যা। সুগন্ধা নামের উত্তরাধিকারী রূপে নলছিটি থানার নিকটে সুন্দরকুল নামে একটি গ্রাম এখনও রয়েছে।

বর্তমানে বরিশালের কালিজিরা নদীটিকে সুগন্ধার উত্তরাধিকারী নদী বিবেচনা করা হয় এবং সে মোতাবেক কালিজিরা যেখানে কীর্তনখোলার সাথে মিলিত হয়েছে সেখান থেকে শুরু করে বিষখালী পর্যন্ত জলধারাটি সুগন্ধা নদীরূপে বিবেচনা করা হয়। মূলত সুগন্ধা হলো ভূগোল থেকে হারিয়ে গিয়ে ইতিহাসের পাতায় অবস্থান নেয়া একটি নদী।

সুগন্ধার শাখা নদীগুলো প্রাচীনকালে ক্ষীণ ছিল। সুগন্ধার অনেক শাখা নদী থাকায় জলস্রোত প্রবল ছিল না। পরে ধীরে ধীরে নদীগুলো ভরে যায়। এক সময়ে শিকারপুর থেকে পোনাবালিয়া পর্যন্ত শুধু নদীর জলই ছিল, স্থলভাগ ছিল না। একদিনের যাত্রাপথ ছিল। পরে চর পড়ে বাবুগঞ্জ ও কোতোয়ালি থানার স্থলভাগ সৃষ্টি হয়। এমনিভাবে অনেক নদী মরে যায় এবং কয়েকটি শাখা নদীতে স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে।

আড়িয়াল খাঁ- রামায়ণে বর্ণিত পাবনী নদী মধ্যযুগে ক্ষীণ হয়ে পদ্মার সাথে মিলিত হয় এবং আন্দাল খাল বা আড়িয়াল খাঁ নামে ফরিদপুর হয়ে কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়ে বরিশালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। আড়িয়াল খাঁ ফরিদপুর অতিক্রম করে বরিশালে এসে দুধারায় বিভক্ত হয়। এক ধারার নাম হয় টরকী ও অন্য ধারার নাম আড়িয়াল খাঁ রয়ে যায়। পদ্মার প্রধান প্রবাহ আড়িয়াল খাঁ নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। রেনেলের ম্যাপে দেখা যায় ১৮ শতকে মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ নোয়াখালীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো। তখন মেহেন্দীগঞ্জ হতে বিক্রমপুর পর্যন্ত স্থলভাগ ছিল, মাঝখানে কোনা জলবিভজিকা ছিল না। দক্ষিণ শাহবাজপুর বা ভোলা মেহেন্দীগঞ্জের সাথে একত্রিত ছিল।

১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে তিস্তার বন্যার সময় পদ্মার স্রোত আড়িয়াল খাঁ দিয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। ফলে এক রাতে হঠাৎ নয়াভাঙ্গানী নদীর সৃষ্টি হয় এবং মেঘনা নদীর সাথে ছবিপুর নদী হিজলা-মুলাদীর নিকট মিলিত হয়। ছবিপুর নদী ছিল টরকী নদীর পূর্ব ভাগের নাম। দক্ষিণ শাহবাজপুর বা ভোলা এ সময় হতে উত্তর শাহবাজপুর ও বরিশালের মূল ভূখন্ড হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। টরকী, ছবিপুর, নয়াভাঙ্গনী ও আড়িয়াল খাঁ’র প্রবাহ দক্ষিণে প্রায় ২০ মাইল প্রবাহিত হয়ে মেঘনার শাখা ইলিশা নদীর সাথে মেহেন্দীগঞ্জের নিকট মিলিত হয়। আড়িয়াল খাঁ’র দৈর্ঘ্য ২০ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

কীর্তনখোলা- কীর্তনখোলা হলো আড়িয়াল খাঁ’র একটি শাখা নদী। নলছিটির নিকট কালিজিরা নামক স্থানে সুগন্ধার বর্তমান প্রবাহের সাথে মিলিত হয়ে কীর্তনখোলা নদীটি সুগন্ধা নাম ধারণ করে ঝালকাঠির নিকট বিষখালী নদীর সাথে মিশেছে। দৈর্ঘ্য ১৫ মাইল, প্রস্থ আধা-মাইল।

কালাবদর- আড়িয়াল খাঁ’র একটি শাখা ডাকাতিয়া, জাহাপুর, শায়েস্তাবাদ, কালিগঞ্জ প্রভৃতি নামে ভোলার নিকট ইলিশার সাথে মিলিত হয়েছে। মিলিত স্থানের নাম কালাবদর। উনিশ শতকে কালাবদর নদী খুব প্রবল ছিল। ভোলা থেকে কালাবদর পাড়ি দিয়ে বরিশালে আসা বিপজ্জনক ছিল। কালাবদরের কারনে তাই ভোলা ১৮২২ খ্রিঃ হতে ১৮৫৯ সালে পর্যন্ত নোয়াখালী জেলাধীন ছিল।

বিষখালী- বিষখালীর পশ্চিম পারে রাজাপুর, কাঠালিয়া, বামনা, পাথরঘাটা এবং পূর্ব পাড়ে নলছিটি, বেতাগী ও বরগুনার মধ্য দিয়ে বলেশ্বর ও পায়রা নদীর সাথে মিলিত হয়ে হরিণঘাটা নামে সাগরে পতিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ৪০ মাইল, প্রস্থ ১ থেকে ৩ মাইল।

তেঁতুলিয়া– ইলিশা নদী তেঁতুলিয়া নামে ভোলার পশ্চিম পাশ দিয়ে এবং বাকেরগঞ্জ, বাউফল, গলাচিপার পূর্ব পাশ দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। তেঁতুলিয়া নদী দৈর্ঘ্যে ৫০ মাইল এবং প্রস্থে ২ মাইল। তেঁতুলিয়া নদী জেলার দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী।

লোহালিয়া- বাকেরগঞ্জ-পটুয়াখালীর দীর্ঘতম নদী লোহালিয়া। এর পূর্ণ প্রবাহ মূলত কবাই-লোহালিয়া-গলাচিপা নদীর প্রবাহ। এটি বাকেরগঞ্জ থানা হয়ে পটুয়াখালীর ভিতর দিয়ে কারখানা, লোহালিয়া, গলাচিপা ইত্যাদি নামে চরকাজলের নিকট রামনাবাদ নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এ নদী দৈর্ঘ্যে প্রায় ৬০ মাইল।

আগুনমুখা- লোহালিয়া নদী বাকেরগঞ্জ থানা হয়ে পটুয়াখালীর ভিতর দিয়ে কারখানা, লোহালিয়া, গলাচিপা ইত্যাদি নামে চরকাজলের নিকট রামনাবাদ নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এ নদী দৈর্ঘ্যে প্রায় ৬০ মাইল। চরকাজল ও বড়-বাইশদিয়ার নিকট এ নদী আগুনমুখা নামে পরিচিত। আগুনমুখা জেলার বৃহত্তম ও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নদী।

বলেশ্বর- মধুমতি নদী পিরোজপুরের নিকট বলেশ্বর নামে কচা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। বলেশ্বর কচা নাম ধারণ করে মঠবাড়িয়া ও মোরেলগঞ্জ, শরণখোলার মধ্য দিয়ে হরিণঘাটার সাথে মিলিত হয়েছে। কচা সহ এর দৈর্ঘ্য ৪০ মাইল, প্রস্থ ১ থেকে ৩ মাইল।

অখ্যাত নদীসমূহ
ধানসিড়ি- এটি ঝালকাঠি থেকে রাজাপুর পর্যন্ত প্রবাহিত একটি মরা নদী যা বর্তমানে একটি অনাব্য খালে রূপান্তরিত। এর দৈর্ঘ্য ৭ মাইল, প্রস্থ ২০ গজ।

ঘন্টেশ্বর- ১৫শ’ শতকে বিজয় গুপ্তের বর্ণিত ঘন্টেশ্বর নদী আজ একটি ছোট খাল। সে যুগে আড়িয়াল খাঁঁ নদী প্রবল ছিল।

টরকী- আড়িয়াল খাঁ ফরিদপুর অতিক্রম করে বরিশালে এসে দুধারায় বিভক্ত হয়। এক ধারার নাম হয় টরকী। টরকী নদীর দৈর্ঘ্য ১০ মাইল, প্রস্থ আধা মাইল।

ছবিপুর- আড়িয়াল খাঁ’র একটি শাখা নদী। দৈর্ঘ্য ১০ মাইল, প্রস্থ ২ মাইল।

লতা- আড়িয়াল খাঁ’র একটি শাখা নদী। দৈর্ঘ্য ১০ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

নয়াভাঙ্গানী- আড়িয়াল খাঁ’র একটি শাখা নদী। দৈর্ঘ্য ১৫ মাইল, প্রস্থ ২ মাইল।

কচা– এর দৈর্ঘ্য ২৮ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

ইলিশা- ইলিশা মেঘনার একটি শাখা। এটি দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে তেতুলিয়া নাম ধারণ করে। তেতুলিয়াসহ এর দৈর্ঘ্য ৫০ মাইল, প্রস্থ ২ মাইল।

সন্ধ্যা- মূল সুগন্ধার এক ক্ষীণ প্রবাহ সন্ধ্যা নামে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে কাউখালির কাছে কচা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ৫ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

কালিজিরা- এটি শিকারপুরের মূল সুগন্ধার বর্তমান মৃত প্রবাহ। এটি কীর্তনখোলার সাথে মিলিত হয়ে সুগন্ধা নাম ধারণ করেছে। এর দৈর্ঘ্য ১০ মাইল, প্রস্থ ২০০ গজ।

কালীগঙ্গা- মধুমতির সরু একটি সরু একটি শাখা কালীগঙ্গা নামে পিরোজপুরের নিকট কচা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।

হলতা- দৈর্ঘ্য ১২ মাইল, প্রস্থ ২০০ গজ।

দামোদর- মোগল আমলে দামোদর নদী পিরোজপুর শহরের ভিতর দিয়ে বলেশ্বর হতে কালীগঙ্গায় প্রবাহিত হতো। বর্তমান দামোদর নদী একটি ছোট খালে পরিণত হয়েছে।

হিজলা- দৈর্ঘ্য ১৫ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

আন্ধারমানিক- এর দৈর্ঘ্য ১৫ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

নীলগঞ্জ- এর দৈর্ঘ্য ২২ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

পায়রা- এর অপর নাম বুড়িশ্বর। এর দৈর্ঘ্য ৩০ মাইল, প্রস্থ ২ মাইল।

বিঘাই- এর দৈর্ঘ্য ৫ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

কাজল- এর দৈর্ঘ্য ১০ মাইল, প্রস্থ ২ মাইল।

চাকামইয়া- এর দৈর্ঘ্য ৮ মাইল, প্রস্থ আধা মাইল।

শ্রীমন্ত- এর দৈর্ঘ্য ৬ মাইল, প্রস্থ আধা মাইল।

চাওরা- এর দৈর্ঘ্য ১৪ মাইল, প্রস্থ ১ মাইল।

দরিচর- এর দৈর্ঘ্য ৮ মাইল, প্রস্থ ২ মাইল।

শাহবাজপুর- এর দৈর্ঘ্য ৩০ মাইল, প্রস্থ ৪ মাইল।

তথ্যসূত্র:

বরিশালের ইতিবৃত্ত, সাইফুল আহসান বুলবুল, গতিধারা, ঢাকা, এপ্রিল ২০০৯
সিরাজ উদ্দীন আহমেদ। বরিশাল বিভাগের ইতিহাস (১ম খ-)। ভাস্কর প্রকাশনী, ঢাকা ২০১০

আপনার মতমত দিন

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *