পদ্মা নদী | Padma River

Spread the love

পদ্মা নদী (Padma River)মূলত গঙ্গার নিম্ন স্রোতধারার নাম। এটি হিমালয়ে উৎপন্ন গঙ্গানদীর প্রধান শাখা এবং বাংলাদেশের ২য় দীর্ঘতম নদী। আরও নির্দিষ্টভাবে বলা যায় গোয়ালন্দ ঘাটে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গম স্থলের পরবর্তী মিলিত প্রবাহই পদ্মা নামে অভিহিত। রাজা রাজবল্লভের কীর্তি পদ্মার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয় বলে পদ্মার আরেক নাম কীর্তিনাশা।

গঙ্গা-পদ্মা নদীপ্রণালী
গঙ্গা-পদ্মা নদীপ্রণালী (Ganges-Padma River System) দেশের অন্যতম প্রধান নদীপ্রণালী। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ গাঙ্গেয় বদ্বীপ এ নদীপ্রণালী দ্বারা সৃষ্ট। সমগ্র গাঙ্গেয় বদ্বীপ ক্ষুদ্র-বৃহৎ অসংখ্য নদনদী ও স্রোতধারা দ্বারা বিভক্ত। এ সকল নদনদী ও স্রোতধারার কতগুলি বর্তমানে মৃতপ্রায়, কতগুলি নিয়ত প্রবাহমান, আর অন্যগুলি শুধু জোয়ারভাটা খাত হিসেবে প্রবাহমান রয়েছে।

গঙ্গা-পদ্মা নদীপ্রণালী (Ganges-Padma River System)

গঙ্গা-পদ্মা নদীপ্রণালীর প্রধান নদী গঙ্গা হিমালয় পর্বতের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে নির্গত ভাগীরথী এবং মধ্য হিমালয়ের নন্দাদেবী শৃঙ্গের উত্তরে অবস্থিত গাঢ়ওয়াল পার্বত্য অঞ্চল থেকে উৎপন্ন অলকানন্দা নদীর মিলিত ধারা থেকে সৃষ্ট। এ মিলিত ধারা ভারতের হরিদ্বারের কাছে সমভূমিতে পৌঁছে রাজমহল পাহাড়ের পাশ দিয়ে দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। এরপর বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকা বরাবর ১১২ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে রাজশাহী জেলার পশ্চিমাংশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং দক্ষিণ-পূর্বমুখী প্রবাহিত হয়েছে। এরপর এটি আরিচার কাছে গোয়ালন্দঘাটের নিকট যমুনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মা নামে দক্ষিণ-পূর্বে প্রবাহিত হয়। চাঁদপুরের কাছে পদ্মা নদী উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নামেই বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। গঙ্গা-পদ্মা নদীধারার মোট দৈর্ঘ্য ২,৬০০ কিমি।

১৯৮৮ সালে পদ্মা নদীর স্যাটেলাইট ছবি

তবে অপর এক গবেষক বলেছেন, সুনির্দিষ্টভাবে গোয়ালন্দ ঘাটে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গমস্থালের পরবর্তী মিলিত প্রবাহই পদ্মা এবং এর দৈর্ঘ্য ১২০ কিমি ও প্রস্থ ৪-৮ কিমি; অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রবেশের পর হতে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত যে নদীটি প্রবাহিত হয়েছে সেটির নাম পদ্মা নয় বরং গঙ্গা।

পদ্মার সর্বোচ্চ গভীরতা ১,৫৭১ ফুট (৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ফুট (২৯৫ মিটার)। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক পদ্মা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী নং ৩২।

২০০০ সালে পদ্মা নদীর স্যাটেলাইট ছবি

পদ্মার উপনদী ও শাখানদী
পদ্মার প্রধান উপনদী মহানন্দা এবং পুনর্ভবা । মহানন্দা উপনদীটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা এবং পুনর্ভবা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার বিভিন্ন শাখানদীর মধ্যে গড়াই, বড়াল আড়িয়াল খাঁ, কুমার, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব ইত্যাদি অন্যতম। আবার পদ্মার বিভিন্ন প্রশাখা নদীসমূহ হলো- মধুমতী, পশুর, কপোতাক্ষ ইত্যাদি। এই নদীগুলো কুষ্টিয়া,রাজবাড়ী,যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর বরিশাল, পটুয়াখালি ইত্যাদি জেলার উপর দিয়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

২০১৮ সালে পদ্মা নদীর স্যাটেলাইট ছবি

পদ্মার মাৎস্যসম্পদ
রাজশাহী এলাকার পদ্মার উপর গবেষণায় ১১০ প্রজাতির মাছের (৫৯ গণ, ২৮ গোত্র, ১২ বর্গ ও ২ শ্রেণীর অন্তর্গত) তালিকা প্রদান করেন। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকার পদ্মার উপর এক গবেষনায় (ডিসেম্বর ২০০৬-নভেম্বর ২০০৭) ৭৩ প্রজাতির মাছ (৪৪ গণ, ২২ গোত্র, ১০ বর্গ, ২ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত) ও ১১ প্রজাতির মাছব্যাতীত অন্যান্য জলজ প্রাণী (৪ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত) রেকর্ড করেন। একই এলাকায় গবেষণা করে ৫৭ প্রজাতির (২৩ গোত্র, ১১ বর্গের অন্তর্ভুক্ত) দেশীয় ছোট মাছ লিপিবদ্ধ করেন।

পদ্মা নদীতে মাছ ধরায় ব্যবহৃত ৬ ধরনের জাল, ৪ ধরনের ফাঁদ ও ১ ধরনের আঘাতকারী মাছ ধরার যন্ত্র রেকর্ড করেন, এসকল মাছ ধরার সরঞ্জামে মোট ৩৮ প্রজাতির মাছ ধৃত হয় বলে তার গবেষণায় প্রতীয়মান হয়।

অপর একটি গবেষণায় মাছব্যাতীত ৪৭ প্রজাতির মৎস্যভোজী মেরুদণ্ডী প্রাণী রেকর্ড করা হয় যার মধ্যে ২ প্রজাতির উভচর, ৩ প্রজাতির সরিসৃপ, ৪০ প্রজাতির পাখি ও ২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী অন্তর্ভুক্ত।

পদ্মার ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্টসমূহ
মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ঘাটে পদ্মার উপর এক গবেষণায় (ফেব্রুয়ারি-ডিসেম্বর, ২০০২) যে ফলাফলসমূহ লিপিবদ্ধ করেছেন তাহলো- পিএইচ (৬.২-৭.৫), ক্লোরাইড (৬৫.০-৮৫.৬ মিলিগ্রাম/লিটার), ক্ষারত্ব (৫৭.৭-১১০ মিলিগ্রাম/লিটার), মুক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড (২.৩-১৩.৪ মিলিগ্রাম/লিটার), দ্রবীভূত অক্সিজেন (৫.১-১০.৩ মিলিগ্রাম/লিটার), বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমাণ্ড (৩.৪-৭.২ মিলিগ্রাম/লিটার), টোটাল হার্ডনেস (২.৯-৬.৫ মিলিগ্রাম/লিটার), স্থায়ী হার্ডনেস (২.৩-৪.২ মিলিগ্রাম/লিটার), টোটাল সলিডস (১৭৫.৫-৪৭২.১ মিলিগ্রাম/লিটার) এবং দ্রবীভূত সলিডস (৩৫.৫-১৭৯.৯ মিলিগ্রাম/লিটার)।

পদ্মার পানিতে (টি-বাধ, রাজশাহী) বিভিন্ন অজৈব আয়নের পরিমাণসমূহ হলো- ক্যালসিয়াম (১৭.১১-৪৮.৩৭ পিপিএম), সোডিয়াম (১৭.৫১-২০.০৯ পিপিএম), পটাশিয়াম (১.০-৩.৬ পিপিএম), ক্রোমিয়াম (২.৮-৭.০ পিপিএম) ও সালফেট (৪.১৭-৫.৪৮ পিপিএম) এছাড়া তলদেশীয় কাদায়-ক্রোমিয়াম (৩৫-১০৫০ পিপিএম) ও লেড (১২-৪৮ পিপিএম)।

সাহিত্যে পদ্মা
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এই নদীর তীরের মানুষের জীবনকে কেন্দ্র করেই লেখা। পদ্মার নৈসর্গিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নানাভাবে প্রভাবিত করেছে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। তাঁর বিখ্যাত কিছু গানে পদ্মার হারানো ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য্য ফুটে উঠেছে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক রচিত ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসটির উপজীব্য পদ্মার পাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। এই নদীর রূপ দেখে কবি তালহা আজিজ বলেছেন

“পদ্মার তীরেতে বসবাস আমার,
মুগ্ধ আমি রূপ দেখে তার।
এর তীরেই আছে কত শত স্মৃতি।
রাতে জোনাকিরা দেয় জ্যোতি;
মনে হয়, যেন স্বর্গের ছায়া!
কি অপরূপ তার মায়া!”

সমস্যাসমূহ
বর্তমানে পদ্মার সেই প্রবাহ আর নেই। বিগত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগতভাবে পলি জমে নদীর বিভিন্ন স্থানে (বিশেষ করে রাজশাহীতে) অনেক (প্রায়) স্থায়ী চরের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে পানির প্রবাহ ও মাছের বৈচিত্র্যতা ও প্রাচুর্যতাও কমে যাচ্ছে। এছাড়া নদীর বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ মাছ ধরার জাল (কারেন্ট জাল) ব্যবহার করে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ আহরণের ফলেও মাছের উৎপাদনের উপর ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে।

তথ্যসূত্র
(১) চৌধুরী, মাসুদ হাসান, “পদ্মা নদী”, বাংলাপিডিয়া।
(২) মানিক, মোহাম্মদ রাজ্জাক (ফেব্রুয়ারি ২০১৫), “উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী”, (৩) বাংলাদেশের নদনদী: বর্তমান গতিপ্রকৃতি (প্রথম সংস্করণ)।
(৪) Hossain ML, Mahmud J, Islam J, Khokon ZH and Islam S (eds.) (2005) Padma, Tatthyakosh Vol. 1 and 2, Dhaka, Bangladesh, p. 182 (in Bengali).
(৫) বাংলাদেশের নদী: মোকাররম হোসেন
(৬) বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা: ড. সৌমিত্র শেখর
(৭) bdfish.org
(৮) Ahmed A (2004) Ecological studies of the Padma river at Mawa Ghat, Munshiganj I. Physico-chemical properties, Pakistan Journal of Biological Sciences 7(11): 1865-1869.
(৯) Bhuiyan SS, Joadder MAR and Bhuiyan AS (2008) Occurrence of fishes and non-fin fishes of the river Padma near Rajshahi, Bangladesh, Univ. J. Zool. Rajshahi Univ. 27: 99-100.
(১০) Chowdhury MH (2003) Padma River. In: Banglapedia the National Encyclopedia of Bangladesh Vol. 5, Bangladesh Asiatic Society, Dhaka, Bangladesh. pp. 217-218 (in Bengali).
(১২) FRSS (Fisheries Resources Survey System) (2009) Fisheries Statistical Yearbook of Bangladesh 2007-2008, Department of Fisheries, Ministry of Fisheries and Livestock, Dhaka, Bangladesh, 25(1): 1-42.
(১৩) Islam MS and Hossain MA (1983) An account of the fishes of the Padma near Rajshahi, Raj. Fish. Bull. 1(2): 1-31.
(১৪) Haque MS, Hossain MA and Kasem MA (1983) A checklist of the piscivorous vertebrates of the river Padma of Rajshahi district, Raj. Fish. Bull. 1(2): 44-50.
(১৫) Hossain ML, Mahmud J, Islam J, Khokon ZH and Islam S (eds.) (2005) Padma, Tatthyakosh Vol. 1 and 2, Dhaka, Bangladesh, p. 182 (in Bengali).
(১৬) Jewel MAS (2006) Study on fishing gears and socio-economic conditions of fishermen of the Padma river, Abstracts 2nd fisheries conference and research fair 2006, Bangladesh Fisheries Research Forum (BFRF), Dhaka, Bangladesh, p. 61.
(১৭) Samad MA, Asaduzzaman M, Galib SM, Kamal MM and Haque MR (2010) Availability and consumer preference of small indigenous species (SIS) of the river Padma at Rajshahi, Bangladesh, Int. J. BioRes. 1(5): 27-31.
(১৮) Zereen F, Islam F, Habib MA, Begum DA and Zaman MS (1999) Inorganic pollutants in the Padma River, Bangladesh, Environmental Geology 39(9): 1059-1062.

আপনার মতমত দিন

Spread the love

2 thoughts on “পদ্মা নদী | Padma River

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *