বনমোরগ | Junglefowl

Spread the love

বনমোরগ (লাতিন ভাষায়: Gallus) Galliformes (গ্যালিফর্মিস) বর্গের অন্তর্গত Phasianinae (ফ্যাসিয়ানিনি) উপগোত্রের অন্তর্ভুক্ত ১৬টি গণের একটি। Gallus শব্দটি ল্যাটিন ভাষা থেকে উদ্ভূত যার অর্থ “গোলাবাড়ি সংলগ্ন জমির মুরগী”। পৃথিবীতে জীবিত চারটি প্রজাতির পাখি এই গণের অন্তর্ভুক্ত। সবগুলো প্রজাতির আবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।

বৈশিষ্ট্য
প্রজাতিগুলো মাঝারি আকারের ভূচর পাখি। এদের মাথায় ঝুঁটি ও গলার দুই পাশে দু’টি ঝুলন্ত লতিকা থাকে। ডানা গোলাকার; ডানার পঞ্চম প্রান্ত-পালকটি দীর্ঘতম। প্রথমটি দশমটির চেয়ে ছোট। লেজ দু’পাশ থেকে চাপা’ লেজে মোট ১৪টি পালক থাকে। প্রজাতির পুরুষটির মাঝের দু’টি পালক লম্বা ও কাস্তের মত বাঁকানো। ঘাড় ও কোমর সরু এবং লম্বা কাঠির মত পালকে ঘেরা। পা শক্তিশালী ও লম্বা। নখরসহ মধ্যমার চেয়ে বড়। পুরুষটির পায়ের পেছনে গজালের মত লম্বা তীক্ষ্ণ নখর আছে। পুরুষ আর স্ত্রী নমুনার মধ্যে অত্যধিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

প্রজাতিসমূহ
লাল বনমোরগ, Gallus gallus
শ্রীলঙ্কার বনমোরগ, Gallus lafayetii
ধূসর বনমোরগ, Gallus sonneratii
সবুজ বনমোরগ, Gallus varius

লাল বনমোরগ
লাল বনমোরগ বা লাল বনমুরগি (লাতিন ভাষায়: Gallus gallus) (ইংরেজি: Red Jungle fowl) ফ্যাসিয়ানিডি (Phasianidae) গোত্রের অন্তর্গত সর্বাধিক পরিচিত একটি প্রজাতি। ধরে নেওয়া হয়, পৃথিবীর সমস্ত মোরগ-মুরগী আবির্ভূত হয়েছে এই বন মোরগের প্রজাতির কিছুকিছু নমুনার গৃহপালনের মাধ্যমে, তাতে লেগে গেছে কয়েক হাজার বছর। গত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা কমে গেলেও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছায় নি। সেকারণে আই. ইউ. সি. এন. বনমোরগকে Least Concern বা আশঙ্কাহীন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের ১৯৭৪ ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

বিস্তৃতি
নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, ভারত, বাংলাদেশ, চীন, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, লাওস, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় এ পাখি দেখা যায়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, পূর্ব তিমুর, ফিজি, জ্যামাইকা, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, নাউরু, পালাউ, পুয়ের্তো রিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে এদের অবমুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে অবস্থা
বাংলাদেশে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের চিরসবুজ বন, চা-বাগান, শেরপুর ও মধুপুর শালবন ও সুন্দরবনে বনমোরগ বাস করে। একসময় প্রায় সব ধরনের বন-জঙ্গলেই এদের দেখা যেত। কিন্তু ব্যাপক শিকারের কারণে আশঙ্কাজনকভাবে এরা কমে গেছে। আদিবাসীদের কারণে পাহাড়ি বনেও এরা প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো কোনো হাটবাজারে বনমোরগ বিক্রি হয়। তবে সিলেটের চা-বাগান ও সুন্দরবনে এরা মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে।

উপপ্রজাতি
অঞ্চলভেদে লাল বনমোরগের একাধিক উপপ্রজাতি দেখা যায়। এরা হল:

G. g. gallus, ইন্দোচীন
G. g. bankiva, জাভা
G. g. jabouillei, ভিয়েতনাম
G. g. murghi, ভারত ও বাংলাদেশ
G. g. spadiceus, মিয়ানমার
G. g. domesticus, গৃহপালিত মোরগ-মুরগী।

বিবরণ
লাল বনমোরগ খুব সুন্দর ঝালরাবৃত লালচে, সোনালি ও কালো পালক জড়িত পিঠ ও ডানাসম্বৃদ্ধ একটি পাখি। কপোল থেকে পালকহীন মাংসল মণি বা কোম্ব বের হয়েছে। ঠোঁটের নিচে ও কানের সামনে থেকে বের হয়েছে দুটি লাল লতিকা বা পর্দা। পালকহীন চোখের চারিদিকের চামড়া লালচে, নিচের দিকে কালচে। প্রলম্বিত লেজের পালক নিচের দিকে বাঁকানো। বনমুরগী তুলনায় ছোট ও লেজে বাহারি পালক নেই। দেহের পালক সোনালী আভাযুক্ত বাদামী, তার সাথে সামান্য গাঢ় দাগ। মণি, লতিকা ও চোখের কোল বনমোরগের তুলনায় তেমন দর্শনীয় নয়।

আচরণ
লাল বনমোরগ-মুরগী একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে ঘুরে বেড়ায়। মাটি থেকে কুড়িয়ে বিভিন্ন শস্যদানা, ঘাসের গোড়া, কচিপাতা, কেঁচো, কীটপতঙ্গ, ফল এসব খায়। খুব ভোরে ও সন্ধ্যার আগে আগে বনের পাশের খোলা জায়গায় খাবার খেতে আসে। শীতের সময় কুয়াশা থাকা অবস্থায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। বনের কোনো গাছতলায় পাকা ফল ঝরে পড়া শুরু করলে বনমোরগ-বনমুরগী প্রতিদিন সকাল-বিকাল সেই গাছতলায় আসে। আবার বনের বড় গাছে উঠেও এদের ফল খেতে দেখা গেছে। রাত কাটায় উঁচু গাছের ডালে বা বাঁশঝাড়ে। সামান্য শব্দে ভীত হয়ে উড়ে গিয়ে বসবে গাছের মগডালে। পালানোর সময় পোষা মুরগির মতোই কক্ কক্ করে ডাকে।

লাল বনমোরগ বিশেষভাবে একটি আঞ্চলিক পাখি, অর্থাৎ এরা নিজেদের নির্ধারিত সীমায় বসবাস করে, অন্যের অনুপ্রবেশ মোটেও বরদাশত করতে পারে না। প্রজননকালের শুরুতে এ আচরণ অধিকহারে দেখা যায়। এসময় দলপতি বা শক্তিমান মোরগ তিন থেকে পাঁচটি মুরগী নিয়ে দল গঠন করে ঘুরে বেড়ায়। কমবয়েসী মোরগেরা পৃথকভাবে দুই বা তিন সদস্যের দল গঠন করে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, লাল বনমুরগীর বীর্য ফেলে দেবার ক্ষমতা রয়েছে। এরা কেবল দলপতি মোরগের বীর্যই গ্রহণ করে, অন্যসব মোরগের বীর্য ফেলে দেয়।

প্রজনন
জানুয়ারি থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। বনের নির্জন স্থানে পায়ের নখ আঁচড়িয়ে মাটিতে সামান্য গর্ত করে তাতে লাল বনমুরগি শুকনো ঘাস ও কাঠিকুটি বিছিয়ে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে পাঁচ-ছয়টি; রং হালকা থেকে গাঢ় বাদামি। লাল বনমুরগি শুধু ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালন-পালনে ব্যস্ত থাকে। ডিম ফোটে ২০-২১ দিনে। ফোটার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছানাগুলো বাসা ছাড়ে ও মায়ের সঙ্গে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। ১২ সপ্তাহ বয়সে ছানারা দল থেকে বেরিয়ে পড়ে নতুন দলে প্রবেশ করে বা নিজেরাই দল গঠন করে।

শ্রীলঙ্কার বনমোরগ
শ্রীলঙ্কার বনমোরগ (Gallus lafayetii) (ইংরেজি: Sri Lanka Junglefowl বা La Fayette’s Jungle Fowl ) ফ্যাজিয়ানিডি (Phasianidae) গোত্র বা পরিবারের অন্তর্গত গ্যালাস (Gallus) গণের এক প্রজাতির বনমোরগ। পাখিটি সারা বিশ্বে কেবলমাত্র শ্রীলঙ্কায় পাওয়া যায়, অর্থাৎ এটি শ্রীলঙ্কার এন্ডেমিক বা স্থানিক পাখি। ঔপনিবেশিক আমলে এই প্রজাতিটি সিলন বনমোরগ (Ceylon Junglefowl) নামে অভিহিত ছিল। শ্রীলঙ্কার বনমোরগ একই গণের সাধারণ বনমোরগ (Gallus gallus) ও ধূসর বনমোরগের (Gallus sonneratii) সাথে বেশ গাঢ়ভাবে সম্পর্কিত। তবে সবচেয়ে বেশি মিল দেখা যায় সবুজ বনমোরগের (Gallus varius) সাথে। আই. ইউ. সি. এন. এই প্রজাতিটিকে Least Concern বা আশঙ্কাহীন বলে ঘোষণা করেছে। প্রজাতিটি শ্রীলঙ্কার জাতীয় পাখি। সিংহলিজ ভাষায় এর নাম ওয়ালি কুকুলা।

বিবরণ
দূর থেকে দেখলে শ্রীলঙ্কার বনমোরগ প্রায় সাধারণ বনমোরগের মতোই। তবে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। মোরগ সাধারণ বনমোরগের মতোই বড়সড়, সুন্দর ঝালরাবৃত লালচে, সোনালি ও কালো পালক জড়িত পিঠ ও ডানাসম্বৃদ্ধ একটি পাখি। তবে সাধারণ বনমোরগের তুলনায় এরা একটু লম্বাটে। সামনের দিকটা হলদে ও কমলা-লাল রঙের। মাথা থেকে গলা ও মেরুদণ্ডের গোড়া পর্যন্ত পালকের রঙ সোনালী-হলুদ। ডানা ও লেজ কালো ও গাঢ় বেগুনি পালকে আবৃত। প্রলম্বিত লেজের পালক নিচের দিকে বাঁকানো। মুখ ও মুখের আশপাশ পালকহীন এবং লাল রঙের। মাথায় লাল মাংসল ঝুঁটি থাকে। ঝুঁটিতে একছোপ হলুদ রঙ ঝুঁটির সৌন্দর্য্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঠোঁটের নিচে দু’টি লাল ঝুলন্ত লতিকা থাকে। সাদা কর্ণপটহ দৃশ্যমান। চোখের আইরিস হলুদ, পা লাল, ঠোঁট ময়লা হলুদ। মোরগের দৈর্ঘ্য ৬৬-৭২ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৭৯০-১১৪০ গ্রাম।

বনমুরগী তুলনায় ছোট ও লেজে বাহারি পালক নেই। পালক বাদামী ও মেটে-বাদামী। পেটের দিকটা সাদাটে। লেঝের গোড়ায় কিছু কালো ডোরা থাকে। লতিকা থাকে না, ঝুঁটি ছোট ও ফ্যাকাসে বর্ণের। পা হলুদ, ঠোঁট সীসা বর্ণের, চোখের আইরিস বনমোরগের মতোই। বনমুরগীর দৈর্ঘ্য কমবেশি ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৫১০-৬৪৫ গ্রাম।

আচরণ
বনমোরগ-মুরগী একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে ঘুরে বেড়ায়। মাটি থেকে কুড়িয়ে বিভিন্ন শস্যদানা, ঘাসের গোড়া, কচিপাতা, কেঁচো, কীটপতঙ্গ, ফল এসব খায়। খুব ভোরে ও সন্ধ্যার আগে আগে বনের পাশের খোলা জায়গায় খাবার খেতে আসে। শীতের সময় কুয়াশা থাকা অবস্থায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। বনের কোনো গাছতলায় পাকা ফল ঝরে পড়া শুরু করলে বনমোরগ-বনমুরগী প্রতিদিন সকাল-বিকাল সেই গাছতলায় আসে। আবার বনের বড় গাছে উঠেও এদের ফল খেতে দেখা গেছে। রাত কাটায় উঁচু গাছের ডালে বা বাঁশঝাড়ে। সামান্য শব্দে ভীত হয়ে উড়ে গিয়ে বসবে গাছের মগডালে। পালানোর সময় পোষা মুরগির মতোই কক্ কক্ করে ডাকে। বিবর্তনের দীর্ঘ ধারায় এরা শিকারী প্রাণীর হাত থেকে বাঁচার জন্য লুকিয়ে থাকার জটিল পদ্ধতি রপ্ত করেছে।

প্রজনন
বনমোরগ-বনমুরগীর সম্পর্কটা আসলে অনেকটা এক নারী, অনেক পুরুষ সম্পর্কের মত। একটি বনমুরগী দু’টি বা তিনটি বনমোরগের সাথে ছোট দলে ঘুরে বেড়ায়। বনমুরগী কেবল প্রধান মোরগের সাথেই জোড়া বাঁধে। বনমুরগী মাটিতে বাসা করে। অনেকসময় কাঠবেড়ালী বা অন্য পাখির পরিত্যক্ত বাসাতেও বাসা করে। শ্রীলঙ্কার বনমোরগ বাসা তৈরিতে সহায়তা করে, সাধারণ বনমোরগ সেটা করে না।

বাসা বানানো শেষে বনমুরগী ২-৪ টি ডিম দেয়। ডিমের বর্ণে বিভিন্নতা দেখা গেলেও সাধারণত ক্রীম রঙের উপর হলুদ বা গোলাপী বর্ণের ছিট ছিট দেখা যায়। এছাড়াও বেগুনী ও বাদামী বর্ণেরও ছিটা দেখা যায়। লাল বর্ণের ডোরাকাটা ডিমও দুর্লভ নয়। বনমুরগী একাই ডিমে তা দেয়। দলের অন্যান্য পুরুষ সদস্যেরা বাসার আশেপাশে অবস্থান করে ও বাসা পাহারা দেয়। সাধারণত বিশ দিন পরে ডিম ফুটে ছানা বের ফোটার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছানাগুলো বাসা ছাড়ে ও মায়ের সঙ্গে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। শুধু বনমুরগী ছানা প্রতিপালন করে।

ধূসর বনমোরগ
ধূসর বনমোরগ (Gallus sonneratii) (ইংরেজি: Grey Jungle fowl বা Sonnerat’s Jungle fowl) ফ্যাজিয়ানিডি (Phasianidae) গোত্র বা পরিবারের অন্তর্গত গ্যালাস (Gallus) গণের এক প্রজাতির বনমোরগ। পাখিটি সারা বিশ্বে কেবলমাত্র ভারতে পাওয়া যায়, অর্থাৎ এটি ভারতের এন্ডেমিক বা স্থানিক পাখি। ভারতীয় উপদ্বীপ এদের প্রধান আবাসস্থল। যেসব এলাকায় সাধারণ বনমোরগের সাথে সাথে এরাও অবস্থান করে, সেসব অঞ্চলে অনেকসময় এরা সংকর প্রজাতির সৃষ্টি করে। তবে সংকরায়ন খুব বিরল, কারণ বনমোরগের এলাকা মূলত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। কেবলমাত্র আরাবল্লী পর্বতমালায় এই দুই প্রজাতির এলাকা পরস্পর আপতিত হয়েছে। জেনেটিক পরীক্ষণ প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ বনমোরগের চেয়ে শ্রীলঙ্কার বনমোরগের সাথে এরা বেশি সম্পর্কিত। এদের ডাক প্রলম্বিত আর অন্যসব বনমোরগের প্রজাতি থেকে ভিন্ন। মাংসের জন্য এদের শিকার করা হয়। এছাড়া ঘাড়ের লম্বা পালকের জন্যও এদের শিকার করা হয়। এই পালক দিয়ে বড়শির ফাৎনা বানানো হয়।

উপপ্রজাতি
ধূসর বনমোরগ প্রধানত একপ্রজাতিক (Monotypic) হিসেবে পরিচিত। তবে পালকের রঙের বিভিন্নতার আর ডাকের জন্য অনেক সময় এদের দুইটি উপপ্রজাতিতে বিভক্ত করা হয়- G. s. sonneratii এবং G. s. wangyeli. এই উপপ্রজাতিকরণ সর্বত্র সমর্থিত হয় নি।

বিবরণ
ধূসর বনমোরগের দেহের বিভিন্ন স্থানে ধূসর আর রূপালি পালক দেখে অন্যান্য বনমোরগ থেকে এদের খুব সহজেই আলাদা করা যায়। মোরগ সাধারণ বনমোরগের মতোই বড়সড়, সুন্দর ঝালরাবৃতএকটি পাখি। তবে সাধারণ বনমোরগের তুলনায় এরা একটু লম্বাটে। গলা ও ঘাড়ের প্রতিটি পালক কালো রঙের এবং মাথার দিকে হলদে বা সাদা রঙের। ফলে গলা ও ঘাড় কালোর পটভূমিতে সাদা সাদা ফোঁটাযুক্ত মনে হয়। মাথার দিকের ফোঁটাগুলো ঘন ও ছোট, পরবর্তীতে ফোঁটা ক্রমে বড় ও পাতলা হতে থাকে। প্রজনন ঋতুর সময়ে বা পরে ঘাড়ের এই ফোঁটাযুক্ত পালকগুলি থাকে না। পেট ও পিঠের পালক ধূসর বা রূপালি রঙের যাদের প্রান্ত লালচে। ডানা ও লেজ কালো। লেজের কেন্দ্রীয় পালকগুলি লম্বা ও কাস্তের মত বাঁকানো। মুখ ও মুখের আশপাশ পালকহীন এবং লাল রঙের। মাথায় লাল মাংসল ঝুঁটি থাকে। ঠোঁটের নিচে দু’টি লাল ঝুলন্ত লতিকা থাকে। লতিকা ও ঝুঁটি সাধারণ বনমোরগের মত অত বড় নয়। সাদা কর্ণপটহ দৃশ্যমান। চোখের আইরিস হলুদ, পা লাল, ঠোঁট ময়লা হলুদ।

বনমুরগী
বনমুরগী তুলনায় ছোট ও লেজে বাহারি পালক নেই। পালক বাদামী ও মেটে-বাদামী। পেটের দিকের পালক কালো, তাতে অসংখ্য সাদা ছোপ থাকায় প্রায় সাদা বলে মনে হয়। লতিকা থাকে না, ঝুঁটি ছোট ও ফ্যাকাসে বর্ণের। পা হলুদ, ঠোঁট সীসা বর্ণের, চোখের আইরিস মোরগের মতোই।

আচরণ
বনমোরগ-মুরগী একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে বনে, ঘাসবনে বা বাঁশবনে ঘুরে বেড়ায়। মাটি থেকে কুড়িয়ে বিভিন্ন শস্যদানা, ঘাসের গোড়া, কচিপাতা, কেঁচো, কীটপতঙ্গ, ফল, বাঁশের বীজ এসব খায়। খুব ভোরে ও সন্ধ্যার আগে আগে বনের পাশের খোলা জায়গায় খাবার খেতে আসে। শীতের সময় কুয়াশা থাকা অবস্থায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। বনের কোনো গাছতলায় পাকা ফল ঝরে পড়া শুরু করলে বনমোরগ-বনমুরগী প্রতিদিন সকাল-বিকাল সেই গাছতলায় আসে। আবার বনের বড় গাছে উঠেও এদের ফল খেতে দেখা গেছে। রাত কাটায় উঁচু গাছের ডালে বা বাঁশঝাড়ে। সামান্য শব্দে ভীত হয়ে উড়ে গিয়ে বসবে গাছের মগডালে। পালানোর সময় পোষা মুরগির মতোই কক্ কক্ করে ডাকে। ভোরে আর সন্ধ্যাবেলায় বেশি ডাকে। মোরগের ডাক অনেকটা কু-কায়াক-কিউক-কিউক। সাধারণ বনমোরগের মত ডাকার সময় ধূসর বনমোরগ ডানা ঝাপটায় না।

প্রজনন
মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত ধূসর বনমোরগের প্রজনন কাল। এরা মূলত একগামী, তবে বহুগামী হওয়ারও ইতিহাস আছে। বনমুরগী মাটিতে বাসা করে। অনেকসময় কাঠবেড়ালী বা অন্য পাখির পরিত্যক্ত বাসাতেও বাসা করে। বাসা বানানো শেষে বনমুরগী ৪-৭ টি ডিম দেয়। ডিমের বর্ণ সাদা বা খুব হালকা হলুদ। বনমুরগী একাই ডিমে তা দেয়। সাধারণত একুশ দিন পরে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। ফোটার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছানাগুলো বাসা ছাড়ে ও মায়ের সঙ্গে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। এক বছর পর ছানারা বয়োঃপ্রাপ্ত হয়।

সবুজ বনমোরগ
সবুজ বনমোরগ (Gallus varius) (ইংরেজি: Green Jungle fowl, Javan Jungle fowl বা Forktail) ফ্যাজিয়ানিডি (Phasianidae) গোত্র বা পরিবারের অন্তর্গত গ্যালাস (Gallus) গণের এক প্রজাতির বনমোরগ। ইন্দোনেশিয়ার জাভায় এই প্রজাতিটি বেশি দেখা যায় আর সেখানকার এন্ডেমিক বা স্থানিক পাখি। এরা একপ্রজাতিক (Monotypic), অর্থাৎ এদের কোন উপপ্রজাতি নেই। শ্রীলঙ্কার বনমোরগের সাথে এরা সম্পর্কিত। আই. ইউ. সি. এন. এই প্রজাতিটিকে Least Concern বা আশঙ্কাহীন বলে ঘোষণা করেছে।

বিস্তৃতি
ইন্দোনেশিয়ার জাভা, বালি, লম্বক, সুম্বাওয়া, কোমোডো, ফ্লোরেস, রিংকা আর জাভা ও ফ্লোরেসের সাথে সংযুক্ত ছোট ছোট দ্বীপ সবুজ বনমোরগের প্রধান আবাস। আশ্চর্যজনকভাবে জাভার পশ্চিম দিকে এরা অনুপস্থিত। এছাড়া কোকোস দ্বীপপুঞ্জে এদের অবমুক্ত করা হয়েছে। সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এদের বিচরণ। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আর্দ্র বনভূমি, নিম্নভূমি, গুল্ম বন ও শস্যক্ষেত্র এদের প্রধান বিচরণস্থল। এছাড়া বাঁশবন, বনসংলগ্ন ফাঁকা জায়গা আর মোহনা ও নদীর পাড়েও এরা ঘুরে বেড়ায়। পাহাড়ী এলাকা এদের প্রিয় বিচরণস্থল।

বিবরণ
সবুজ বনমোরগ সাধারণ বনমোরগের মতোই বড়সড়, সুন্দর ঝালরাবৃতএকটি পাখি। তবে সাধারণ বনমোরগের তুলনায় এরা গলা ও ঘাড়ের পালকগুলো উজ্জ্বল ও গাঢ় সবুজ। পালকগুলো আঁশের মত বিন্যাস্ত। সবুজ পালক পিঠ পর্যন্ত ছড়ানো। পিঠে সোনালি বর্ণের ঝালরের মত পালক থাকে। ডানা, বুক ও পেট কালো। ডানার উপরের পালকগুলো ঝালরের মত ও উজ্জ্বল লালচে-কমলা রঙের। লেজের পালক সবুজাভ-কালো। লেজের কেন্দ্রীয় পালকগুলি লম্বা ও কাস্তের মত বাঁকানো।একটু লম্বাটে। মুখ ও মুখের আশপাশ পালকহীন এবং লাল রঙের। মাথায় লাল মাংসল ঝুঁটি থাকে। অন্যসব বনমোরগের ঝুঁটির মত কাটা কাটা নয়, বরং গোলাকার। এদের ঝুঁটি ও লতিকা টকটকে লাল নয়, বরং একটু ফ্যাকাসে। ঝুঁটির মধ্যে একটু নীলচে ছোপ থাকে। কর্ণপটহ কালো। চোখের আইরিস হলুদ, পা সাদাটে, ঠোঁট ময়লা হলুদ। দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার।

বনমুরগী তুলনায় ছোট ও এত বাহারি পালক নেই। পালক বাদামী ও মেটে-বাদামী। লেজ ছোট ও কালো রঙের। পিঠের দিক কালো অনিয়মিত দাগযুক্ত। লতিকা থাকে না, ঝুঁটি ছোট ও ফ্যাকাসে বর্ণের। পা সাদাটে, ঠোঁট সীসা বর্ণের, চোখের আইরিস কালচে। দৈর্ঘ্য কমবেশি ৪২ সেন্টিমিটার।

আচরণ
বনমোরগ-মুরগী একাকী, জোড়ায় বা সর্বোচ্চ সাত সদস্যের ছোট দলে ঘুরে বেড়ায়। দলে একাধিক মুরগী ও যুবক মোরগ একটি প্রধান মোরগের তত্ত্বাবধানে থাকে। মাটি থেকে কুড়িয়ে বিভিন্ন শস্যদানা, ঘাসের গোড়া, কচিপাতা, কেঁচো, গুহাবাসী কীটপতঙ্গ, ক্যাকটাস ফল, ছোট সরীসৃপ, ব্যাঙ এসব খায়।[২] তবে জোয়ার চলে গেলে নদীর পাড়ে এদের বড় বড় দলে (বিশ সদস্যের বা তার বেশি) ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এসময় এরা মূলত আটকে পড়া সামুদ্রিক ও জলজ জীব খেতে আসে। এসময় এরা জলজ পোকামাকড়, তারামাছ, লোনাপানির ও মিঠাপানির শামুক, জেলিফিশ, কাঁকড়া ইত্যাদি খায়। আবার খুব ভোরে ও সন্ধ্যার আগে আগে বনের পাশের খোলা জায়গায় খাবার খেতে আসে। শীতের সময় কুয়াশা থাকা অবস্থায় খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। বনের কোনো গাছতলায় পাকা ফল ঝরে পড়া শুরু করলে বনমোরগ-বনমুরগী প্রতিদিন সকাল-বিকাল সেই গাছতলায় আসে। আবার বনের বড় গাছে উঠেও এদের ফল খেতে দেখা গেছে। রাত কাটায় ১৫ থেকে ২০ ফুট উঁচু গাছের ডালে বা বাঁশঝাড়ে। সামান্য শব্দে ভীত হয়ে উড়ে গিয়ে বসবে গাছের মগডালে। পালানোর সময় পোষা মুরগির মতোই কক্ কক্ করে ডাকে। সর্বোচ্চ সাত মিটার উুঁচু পর্যন্ত উড়তে পারে। এমনিতে একটানা অনেকদূর উড়ে যেতে পারে। গ্যালিফর্মিস বর্গের পাখিরা সাধারণত এতটা উড়তে পারে না। এমনও দেখা গেছে যে এরা সাগর পাড়ি দিয়ে এক দ্বীপ থেকে উড়ে আরেক দ্বীপে যাচ্ছে। কোমোডো, রিংকা আর ফ্লোরেন্স দ্বীপের মাঝে এমনটা প্রায়ই দেখা যায়। ভোরে আর সন্ধ্যাবেলায় বেশি ডাকে। মোরগ চেক্-ক্রে-কি করে নিয়মিত বিরতিতে একটানা ১০-১৫ বার ডাকে। অন্যসব বনমোরগের তুলনায় এদের সামাজিক আচরণ বেশ জটিল।

প্রজনন
মধ্য এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সবুজ বনমোরগের প্রজনন কাল। বনমুরগী ঘন ঝোপ ও ঘাসবনে মাটিতে বাসা করে। বাসা বানানো শেষে বনমুরগী ৫-১০ টি ডিম দেয়। ডিমের রঙ ফ্যাকাসে সাদা, যাতে ছোট ফোঁটা থাকে। সাধারণত একুশ থেকে চব্বিশ দিন পরে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। ফোটার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ছানাগুলো বাসা ছাড়ে ও মায়ের সঙ্গে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। এক বছর পর ছানারা বয়োঃপ্রাপ্ত হয়। তবে দুই বছর বয়সের আগে এরা প্রজনন করে না।

মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক
সবুজ বনমোরগ ব্যাপকভাবে গৃহে পালন করা হয়। এর ফলে এই প্রজাতিটির মাঝে জেনেটিক বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এছাড়া গৃহপালিত মোরগ-মুরগির সাথে এদের সংকরায়নের ফলে বেকিসার নামে একটি সংকর প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় বেকিসার একটি জনপ্রিয় মুরগীর প্রজাতি হিসেবে পরিগণিত। সবুজ বনমোরগের ঝলমলে রঙ আর অনন্য ডাকের জন্য পোষা জীব হিসেবেও এদের বেশ কদর রয়েছে।

আপনার মতমত দিন

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *