তুলসী | Tulsi | Ocimum tenuiflorum

Spread the love

তুলসী (Tulsi) অর্থ যার তুলনা নেই। তুলসী গাছ লামিয়াসি পরিবারের অন্তর্গত একটি সুগন্ধী উদ্ভিদ। উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘Ocimum tenuiflorum’, ইংরেজি নাম ‘Holy Basil/Common basil’, পরিবার: Labiatae। বাংলাদেশে যে চার প্রকার তুলসী গাছ দেখা যায় সেগুলি হলো: বাবুই তুলসী, রামতুলসী, কৃষ্ণ-তুলসী, ও শ্বেত তুলসী।

প্রচলিত নাম
সুরসা, তুলসী (সংস্কৃত), তুলসী (বাংলা), তুলসী (তামিল), তুলসী (হিন্দি), উলসী বাদরুজ (আরবি)।

হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি একটি পবিত্র উদ্ভিদ হিসাবে সমাদৃত। ব্রহ্মকৈবর্ত পুরাণে তুলসীকে ‘সীতাস্বরূপা’, স্কন্দপুরাণে ‘লক্ষীস্বরূপা’, চর্কসংহিতায় ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’, ঋকবেদে ‘কল্যাণী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হিন্দুরা পূজায় এই গাছের পাতা ব্যবহার করে।

বর্ণনা
তুলসী একটি ঘন শাখা প্রশাখা বিশিষ্ট ২/৩ ফুট উঁচু একটি চিরহরিৎ গুল্ম। এর মূল কাণ্ড কাষ্ঠল, পাতা ২-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। পাতার কিনারা খাঁজকাটা, শাখাপ্রশাখার অগ্রভাগ হতে ৫ টি পুষ্পদণ্ড বের হয় ও প্রতিটি পুষ্পদণ্ডের চারদিকে ছাতার আকৃতির মত ১০-২০ টি স্তরে ফুল থাকে। প্রতিটি স্তরে ৬টি করে ছোট ফুল ফোটে। এর পাতা, ফুল ও ফলের একটি ঝাঁঝাল গন্ধ আছে।

প্রাপ্তিস্থান
বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় সর্বত্র দেখা যায়। ভারতে বাণিজ্যক ভাবে চাষ হয়। জুলাই, আগস্ট বা নভেম্বর ডিসেম্বর এতে মঞ্জরী দেখা দেয়। সমতলভূমি থেকে শুরু করে হিমালয়ের পাদদেশে প্রায় ৬০০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত এদের জন্মাতে দেখা যায়।

সাধারণ গুণ
সুগন্ধিযুক্ত, কটু তিক্তরস, রুচিকর। এটি সর্দি, কাশি, কৃমি ও বায়ুনাশক এবং মুত্রকর, হজমকারক ও এন্টিসেপটিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে বিশেষ করে কফের প্রাধান্যে যে সব রোগ সৃষ্টি হয় সে ক্ষেত্রে তুলসী বেশ ফলদায়ক।

ব্যবহার্য অংশ
ঔষধ হিসাবে এই গাছের ব্যবহার্য অংশ হলো এর রস, পাতা এবং বীজ।

শিকড় ও পাতা সংগ্রহ
সারা বছর এ গাছ থেকে শিকড় ও পাতা সংগ্রহ করা যায়। শীত কালের শেষে গাছে ফুল আসে। বসন্তে ফল পেকে যায়। জুলাই-আগষ্ট বা নভেম্বর-ডিসেম্বর এতে মঞ্জরী দেখা দেয়। বসন্তের শেষে বৈশাখে বীজ সংগ্রহ করা যায়।

চাষাবাদ
পানি জমেনা এমন উঁচু ভেজা মাটিতে কিছুটা ছায়া যুক্ত যায়গায় এ গাছ ভাল জন্মে। বীজতলা ভাল ভাবে চাষ করে শুকনো বীজ রোপন করতে হয়। কিছুদিনের ভিতর চারা গজিয়ে উঠে। আবাদী অনাবাদী ও বনজ সব ধরনের জমিতে তুলসী হয়ে থাকে।

উপকারীতা
আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের সর্দি-কাশিতে তুলসী পাতার রস ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়। এসব ক্ষেত্রে কয়েকটি তাজা তুলসী পাতার রসের সাথে একটু আদার রস ও মধুসহ খাওয়ানো হয়। বাচ্চাদের সর্দি-কাশিতে এটি বিশেষ ফলপ্রদ। তাজা তুলসী পাতার রস মধু, আদা ও পিঁয়াজের রসের সাথে এক সাথে পান করলে সর্দি বের হয়ে যায় এবং হাপানিতে আরাম হয়। তুলসী পাতার রসে মধু মিশিয়ে খাওয়ালে বাচ্চাদের পেট কামড়ানো, কাশি ও লিভার দোষে উপকার পাওয়া যায়। তুলসী পাতা ও দুর্বার ডগা বেটে গায়ে মাখলে ঘামাচি ও চুলকানি ভাল হয়। স্থানীয়ভাবে তুলসী পাতার রস দাদ ও অন্যান্য চর্মরোগে ব্যবহার করলে বেশ উপকার পাওয়া যায়। পাতার রস ফোঁটা ফোঁটা করে কানে দিলে কানের ব্যথা সেরে যায়।, পাতা ও শিকড়ের ক্বাথ ম্যালেরিয়া জ্বরের জন্য বেশ উপকারী। ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে প্রতিদিন সকালে গোল মরিচের সাথে তুলসী পাতার রস খেতে দেয়া হয়। যতদিন সম্ভব খাওয়া যায়। বসন্ত, হাম প্রভৃতির পিড়কা বা পুঁজ ঠিকমত বের না হলে তুলসী পাতার রস খেলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসবে। তুলসী পাতার রসের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে খেলে ক্রিমি রোগে বেশ উপকার পাওয়া যায়। শুষ্ক তুলসী পাতার ক্বাথ সর্দি, স্বরভঙ্গ, বক্ষপ্রদাহ, উদারাময় প্রভৃতি রোগ নিরাময় করে থাকে।

অজীর্ণজনিত পেট ব্যথায় তুলসী পাতার বেশ উপকার সাধন করে থাকে। এটি হজমকারক। প্রতিদিন সকালে ১৮০ গ্রাম পরিমান তুলসী পাতার রস খেলে পুরাতন জ্বর, রক্তক্ষয়, আমাশয়, রক্ত অর্শ এবং অজীর্ণ রোগ সেরে যায়। বাত ব্যথায় আক্রান্ত স্থানে তুলসী পাতার রসে ন্যাকড়া ভিজিয়ে পট্টি দিলে ব্যথা সেরে যায়। বোলতা, ভীমরুল, বিছা প্রভৃতি বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ কামড়ালে ঐ স্থানে তুলসী পাতার রস গরম করে লাগালে জ্বালা-যন্ত্রণা কম হয়।যারা সহজেই সর্দিতে আক্রান্ত হয় (বিশেষ করে শিশুদের) তারা কিছুদিন ৫ ফোঁটা মধুর সাথে ১০ ফোঁটা রস খেলে সর্দি প্রবণতা দূর হয়। তুলসী মূল শুক্র গাঢ়কারক এবং বাজীকারক। তুলসী পাতার ক্বাথ, এলাচ গুঁড়া এবং এক তোলা পরিমাণ মিছরী পান করলে ধাতুপুষ্টি সাধিত হয় যতদিন সম্ভব খাওয়া যায়। এটি অত্যন্ত ইন্দ্রিয় উত্তেজক। প্রতিদিন এক ইঞ্চি পরিমাণ তুলসী গাছের শিকড় পানের সাথে খেলে ধ্বজভংগ বা যৌনদূর্বলতা রোগ সেরে যায়। কোন কারনে রক্ত দূষিত হলে কাল তুলসিপাতার রস কিছুদিন খেলে উপকার পাওয়া যায়। শ্লেষ্মার জন্য নাক বন্ধ হয়ে কোনো গন্ধ পাওয়া না গেলে সে সময় শুষ্ক পাতা চূর্ণের নস্যি নিলে সেরে যায়। পাতাচূর্ণ দুই আঙ্গুলের চিমটি দিয়ে ধরে নাক দিয়ে টানতে হয়। তুলসী পাতা দিয়ে চায়ের মত করে খেলে দীঘদিন নীরোগ থাকা যায়। তুলসী চা হিসাবে এটি বেশ জনপ্রিয়।

তুলসিপাতার রসে লবন মিশিয়ে দাদে লাগালে উপশম হয়। তুলসীর বীজ পানিতে ভিজালে পিচ্ছিল হয়। এই পানিতে চিনি মিশিয়ে শরবতের মত করে খেলে প্রস্রাব জনিত জ্বালা যন্ত্রনায় বিশেষ উপকার হয়। মুখে বসন্তের কাল দাগে তুলসীর রস মাখলে ঐ দাগ মিলিয়ে যায়। হামের পর যে সব শিশুর শরীরে কাল দাগ হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে তুলসী পাতার রস মাখলে গায়ে স্বাভাবিক রঙ ফিরে আসে।

তুলসী পাতা কিডনীর বেশ কিছু রোগের সমাধান করে দিতে পারে। তুলসী পাতার রস প্রতিদিন পান করলে কিডনীতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। যদি কিডনীতে পাথর হয় তবে তুলসী পাতার রস টানা ৬ মাস পান করলে পাথর মূত্রের সঙ্গে বেরিয়ে যায়।

সামান্য গরম পানিতে তুলসী পাতা দিয়ে সিদ্ধ করে নিয়ে, সেই পানি দিয়ে গার্গল করলে গলার ব্যাথা দ্রুত সেরে যাবে। তুলসী পাতা হার্টের কর্মক্ষমতা বাড়ায় ও এর স্বাস্থ্য ভালো রাখে। মাথা ব্যাথা ও শরীর ব্যাথা কমাতে তুলসী খুবই উপকারী। পোকার কামড়ে আক্রান্ত স্থানে তুলসী পাতার তাজা রস লাগিয়ে রাখলে ব্যাথা ও জ্বলা থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়া যায়। চর্বিজনিত হৃদরোগে এন্টি অক্সিডেন্টের ভূমিকা পালন করে তুলসী। তুলসীর অ্যালকোহলিক নির্যাস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। দাঁতের রোগে উপশমকারী বলে টুথপেস্ট তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। তুলসীর ভিটামিন সি ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে। এই উপাদানগুলো নার্ভকে শান্ত করে। এছাড়াও তুলসী পাতার রস শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। ভিটামিন সি, ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস ও এর এসেন্সিয়াল অয়েলগুলো চমৎকার অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কাজ করে যা বয়সজনিত সমস্যাগুলো কমায়।

পেট খারাপ হলে তুলসীর ১০টা পাতা সামান্য জিরার সঙ্গে পিষে ৩-৪ বার খান৷ সমস্যা চলে যাবে। বারবার টয়লেটে যাওয়া বন্ধ হবে। জ্বর হলে পানির মধ্যে তুলসী পাতা, গোল মরিচ এবং মিছরি মিশিয়ে ভাল করে সিদ্ধ করুন৷ অথবা তিনটি দ্রব্য মিশিয়ে বড়ি তৈরি করুন। দিনের মধ্যে তিন-চার বার ওই বড়িটা পানির সঙ্গে খান৷ জ্বর খুব তাড়াতাড়ি সেরে যাবে।

শরীরের কোন অংশ যদি পুড়ে যায় তাহলে তুলসীর রস এবং নারকেলের তেল ফেটিয়ে লাগান, এতে জ্বালাপোড়া কমে যাবে। পোড়া জায়গাটা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে এবং পোড়া দাগ ওঠে যাবে। বমি কিংবা মাথা ঘুরলে তুলসী পাতার রসের মধ্যে গোলমরিচ মিশিয়ে খেলে বিশেষ উপকার পাওয়া যাবে। সকালবেলা খালি পেটে তুলসী পাতা চিবিয়ে রস পান করলে খাবার রুচি বাড়ে। চোখের সমস্যা দূর করতে রাতে কয়েকটি তুলসী পাতা পানিতে ভিজিয়ে রেখে ওই পানি দিয়ে সকালে চোখ ধুয়ে ফেলুন। মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে দিনে ৪-৫ বার তুলসী পাতা চিবান৷ ত্বকের চমক বাড়ানোর জন্য, ত্বকের বলিরেখা এবং ব্রন দূর করার জন্য তুলসী পাতা পিষে মুখে লাগান৷ বুদ্ধি এবং স্মরণশক্তি বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন ৫-৭ টা তুলসী পাতা চিবান৷ প্রস্রাবে জ্বালা-পোড়া হলে তুলসী পাতার রস ২৫০ মিলি দুধ অথবা ১৫০ মিলি পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করুন৷ তুলসী মূল শুক্র গাঢ় কারক। তুলসি পাতার রসে লবন মিশিয়ে দাদে লাগালে উপশম হয়। তুলসীর বীজ পানিতে ভিজালে পিচ্ছিল হয়। এই পানিতে চিনি মিশিয়ে শরবতের মত করে খেলে প্রস্রাবজনিত জ্বালা উপশম হয়।

সূত্র
(১) ‘The Plant List: A Working List of All Plant Species’
(২) চিরঞ্জীব বনৌষধী
(৩) আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য
(৪) উইকিপিডিয়া

আপনার মতমত দিন

Spread the love

goECO

We are the first generation to be aware of environmental conservation and we are the last to protect it. lets protect and conserve the earth together.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *