অবিরাম বিপর্যয়ে বাংলাদেশ নদী নিয়ে ভরসাতেই হতাশা

Spread the love

মোস্তফা কামাল
বুলবুল প্রথম নয়। শেষও নয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশ একের পর এক এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার। সেইসঙ্গে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের ঘনঘটা। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছে জলবায়ু। বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। তা যত বাড়বে, ততই তলিয়ে যাবে বিভিন্ন দেশের নিম্নাঞ্চল। এই ঝুঁকির শীর্ষ অবস্থানে বাংলাদেশ। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের হানার মাত্র কদিন আগে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আয়োজিত ৩৫তম আসিয়ান সম্মেলনে এমন তথ্য তুলে ধরেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতিয়েরেস।

শুধু জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুহারা হবে বলে আভাসও দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এসময় সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকাও তিনি উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্তদের সিংহভাগ হবে চীনের। যার সংখ্যা অন্তত নয় কোটি ৩০ লাখ। বাংলাদেশে চার কোটি ২০ লাখ মানুষের ক্ষতি হবে। ভারতে তিন কোটি ৬০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় দুই কোটি ৩০ লাখ মানুষের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া বাকিরা জাপানসহ এশিয়ারই বিভিন্ন দেশের মানুষ। তবে জনসংখ্যা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশই।

শঙ্কিত হওয়ার এমন আরো অনেক খবরের কিলবিল। চীন, যুক্তরাজ্য, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং জাপানের পৃষ্ঠপোষকতায় ২৯টি মেগা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ কার্বন বোমায় পরিণত হতে পারে বলেও তথ্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক গবেষণা সংস্থা মার্কেট ফোর্সেস এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থ্রিফিফটি ডট অর্গের এ মর্মে দেয়া গবেষণা প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাপী একযোগে প্রকাশ হয়েছে সম্প্রতি।

বাংলাদেশে সম্মিলিতভাবে এটি প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা এবং ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশ। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে যে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছে তা থেকে ২০৩১ সালের মধ্যেই ১১৫ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। সম্প্রতি দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরেক ভড়কে যাওয়ার তথ্য। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে। আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আছে চীন। ভারত তৃতীয় অবস্থানে।

তৃতীয় অবস্থানে থাকার পরও ভারত তার নদ-নদী ও পরিবেশ নিয়ে যারপর নাই চিন্তিত। নিচ্ছে নানা উদ্যোগও। নিজেদেরগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের নদীগুলো নিয়েও ভাবনার শেষ নেই ভারতের। আমাদের নদীগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে চায় তারা। সেইলক্ষ্যে চলছে দেশটির নানা পরিকল্পনা। এর অংশ হিসেবে ভারত তার উত্তর-পূর্বের কানেকটিভিটিকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিতেও পারে। ভারতের উত্তর-পূর্ব ভূগোলের বন্দী। ভূবেষ্ঠিত ও চীন, ভুটান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশীদের দিয়ে ঘিরে থাকা উত্তর-পূর্বের সঙ্গে অবশিষ্ট ভারতের একমাত্র স্থলভিত্তিক সংযোগস্থল হলো ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত শিলিগুড়ির ‘চিকেনস নেক’। ফলে কৌশলগতভাবে এখানে সহজেই বিঘ্ন ঘটনো সম্ভব। এর মানে এই যে পণ্য, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি প্রবাহ করার স্থলভিত্তিক পরিবহন ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক সীমিত, অত্যন্ত বৈরী ও সরু।

ভারত এই সমস্যাটির সমাধানের জন্য দ্বিমুখী সমাধানের কথা ভেবেছে। একটি হলো সমুদ্র বাণিজ্য চাঙ্গা করার জন্য এই এলাকার নদী নেটওয়ার্ককে সক্রিয় করা। দ্বিতীয়ত, উত্তর-পূর্বের দক্ষিণ অংশ তথা আগরতলা সাগর থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে, একটি বিদেশী ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন। সাগরে প্রবেশের সুযোগ কানেকটিভিটিকে ব্যাপকভাবে বাড়াবে। তবে দুটি অংশের চাবিই বাংলাদেশের হাতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অপসারণের মাধ্যমে তা খোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের সময় এ ব্যাপারে সক্রিয় প্রয়াস চালানো হয়। কলকাতা থেকে ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত ক্রমবর্ধমান ইন্দো-বাংলাদেশ বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত গাঙ্গেয় নেটওয়ার্ক উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন পয়েন্ট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে। আগরতলাকে সড়কপথে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের সাথে সংযুক্ত করার আরেকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটেই এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্যও আশীর্বাদ জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নদীগুলো। বাংলাদেশে নদ-নদী নিয়ে এ ধরনের ভাবনা ও সিদ্ধান্ত কার্যকরে ভরসা করার প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে দেশের নদীগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে অনেক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা যা কার্যকর হলে পাল্টে যাবে নদীসহ গোটা দেশের দৃশ্যপট। বাংলার বুকে শিরা-উপশিরা হয়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলো নিয়ে রয়েছে তার যুগান্তকারী স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিএ। নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবসহ কমিটেড কিছু কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাপূরণে যারপরনাই সচেষ্ট। নৌ-সেক্টরের ইমেজ অনন্য উচ্চতায় নেয়ার চেষ্টায় কোনো কার্পণ্য করছেন না তারা। কিন্তু, ভরসার জায়গায় ভূতের বাস।

প্রধানমন্ত্রীর ভিশনারি উদ্যোগগুলো বানচাল হয়ে যাচ্ছে রহস্যজনকভাবে। এ নিয়ে দুঃখজনক খবরের ছড়াছড়ি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকরে ক্ষেত্রবিশেষে বাধ সাধছেন প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষকর্তা। অপেশাদার আচরণ ও নানা কর্মকাণ্ডে তিনি গোটা প্রতিষ্ঠানটিতে স্থবিরতা নামিয়ে দিয়েছেন। এর জেরে প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্যই ভণ্ডুল হতে বসেছে। নৌ-বন্দর পরিচালনা, বিভিন্ন অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি নির্মাণ এবং ব্যবস্থাপনায় ভর করেছে বন্ধাত্ব। দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা তার বৈশিষ্ট্যের মতো। বিআইডব্লিউটিতে প্রেষণে নিয়োজিত এই কর্তার সহকর্মীদের সঙ্গে মারামারির রেকর্ডও রয়েছে। তা’হলে কোন খেয়ালে পড়েছে আমাদের এই প্রতিষ্ঠানটি?

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রের এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে লঞ্চ, স্টিমার, কার্গো, ট্রলার, ফেরি নৌকা এবং বার্জের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন মালামাল পরিবহন হয়। নৌপথে পরিবহন ব্যয় সড়কপথের চেয়ে অন্তত ২০ গুণ কম হয়। নদীর নাব্যতা না থাকায় শীতকালে সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, যা দেশে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে, শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। নদীর এ অপমরণের জেরে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে জনজীবনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অভিঘাত নেমে আসে। নদীহীন জনপদে নদীর জন্য শুধু হাহাকারই নয়, বহুমাত্রিক সংকটও তৈরি হচ্ছে।

যে নদী নিজেকে নিঃস্ব করে দিয়েছে, আমরা শুধুই নিয়েছি। লাখো বছরের প্রক্রিয়ায় পলি সঞ্চয় করে নদীই গড়ে তুলেছে ‘ব’ আকৃতির পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের প্রধান নদীগুলো তার যৌবন হারাচ্ছে, শাখা নদী, উপনদীগুলো মরে বিলীন হয়েছে। সঙ্গে মরছে নদীর ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশও। নদীর ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবনও। এই আলোকেই নদী নিয়ে সরকারের নানা ভাবনা। নেয়া হয়েছে লাখ লাখ কোটি টাকার প্রকল্প। কিন্তু, ভরসাতেই হতাশা। গোলমাল। সরকারের ভাবনাগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ববান প্রতিষ্ঠানেই অচলায়তন চললে এ ভূত তাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকে না।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।
প্রথম প্রকাশ: জাগোনিউজ২৪.কম, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯

আপনার মতমত দিন

Spread the love

goECO

We are the first generation to be aware of environmental conservation and we are the last to protect it. lets protect and conserve the earth together.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *