রায়মঙ্গল নদী | Raimangal River

Spread the love

রায়মঙ্গল নদী বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের শেষ প্রান্তে ভারত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমানা ধরে এই নদীর অবস্থান। নদীটির দৈর্ঘ্য বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য ৬২ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ২২৬৫ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক রায়মঙ্গল নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৮৩।

প্রবাহ
রায়মঙ্গল নদটির মূল প্রবাহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা থেকে এসেছে। এই নদী শ্যামনগর থানাধীন সুন্দরবনের ১৬৫ নং লটের কাছে পৌছে প্রায় ২০ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমানা ধরে দক্ষিণমুখী চলেছে। এরপর পুরোপুরি বাংলাদেশে ঢুকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বঙ্গপসাগরে পড়েছে। রায়মঙ্গল নদীটির একটি শাখা ডান দিকে আন্তর্জাতিক সীমানা ধরে ভারত থেকে আশা হাড়িয়াভাঙ্গা নদীতে পড়েছে। যৌথ নদী কমিশনের তালিকায় হাড়িয়াভাঙ্গার নাম নেই, যদিও সেটিও একটি সীমান্ত নদী। হাড়িয়াভাঙ্গা নদী ভারত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমানা ধরে এগিয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার চলার পর আবার রায়মঙ্গল নদীর সাথে মিলে সাগরে পড়েছে। মোহনায় রায়মঙ্গল নদীর মুখ ফানেলের মতো। হাড়িয়াভাঙ্গা নদী ও রায়মঙ্গল নদের মাঝে বাংলাদেশের সুন্দর বনের ভেতরে নদীর নাম তালপট্টি। রায়মঙ্গল ও হাড়িয়াভাঙ্গা মিলিত প্রবাহ সাগরে পড়ার মুখে একটি নতুন দ্বীপ জেগে উঠেছিলো যার বাংলাদেশী নাম ছিলো দক্ষিণ তালপট্টি আর ভারতীয় নাম পূর্বাশা। এই দ্বীপের অধিকার নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে টানাপোড়েন ছিলো। দি হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের সালিশী আদালতে বিষয়টি মীমাংসার সময়কালে দ্বীপটি সাগরের জোয়ারে ভেঙ্গে হাড়িয়ে যায়। ০৭ জুলাই ২০১৪ সালে সালিশী আদালত ভারত বাংলাদেশের যে সাগরসীমা চিহ্নিত করেছে তার তার রেখাগুলি ঐ নিশ্চিহ্ন দ্বীপের পূর্বের অবস্থান ভেদ করে গেছে।

রায়মঙ্গল নদীর স্যাটেলাইট চিত্র (গুগল থেকে)

হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর উজানে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অবস্থিত। এই নদীর আরো উজানে কলকাতা নগরীর পূর্ব দিকের জলাশয় থেকে উৎপন্ন বিদ্যাধরী নদীর প্রবাহ গ্রহণ করে। পশ্চিবঙ্গের সুন্দরবনের ভেতরে রায়মঙ্গল নদী ও হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর সংযোগ আছে। রায়মঙ্গল নদী ভাটিতে এসে যেখানে দুই দেশের সীমানা পৌছেছে সেখানে উত্তর দিক থেকে কালিন্দী নদী এসে মিলিত হয়েছে। ভারতের ভেতরে রায়মঙ্গল নদীর তীরে হেমনগর বন্দর অবস্থিত। ভারত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচর রুটের প্রান্তিক বন্দর হেমনগর থেকে ভারতীয় নৌ যানগুলি এসে কালিন্দী নদী হয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবনের ভেতরের খাড়িগুলিতে প্রবেশ করে এরপর মংলা, বরিশাল হয়ে যমুনার পথে ভারতের আসাম যায় এবং মেঘনার পথে আশুগঞ্জ ভৈরব হয়ে ভারতের করিমগঞ্জ পর্যন্ত যায়। বাংলাদেশের ভেতরে রায়মঙ্গল নদীর কোন শাখা নদী নেই।

রায়মঙ্গল নদীর উপর সুন্দরবনের ভেতর থেকে যেসব উপনদী এসে পতিত হয়েছে তার মধ্যে আছে দাইচি, কচিকাটা, আঠারোবাঁকি, নোতাবেল, হিলচর ও যমুনা নদী। যমুনা নদীরে উপরে সুন্দরবনের ভেতরে যেসব উপনদী এসে পড়েছে সেগুলো হচ্ছে, মাদারগাঙ্গ, চুরকুনী গাঙ, দিংকামারী, খেশনখালী, কলকিবাড়ী, জালকাঠী ও মান্দারবাড়ী। রায়মঙ্গল নদীর শেষ অংশে বাম তীরে মান্দরবাড়ি দ্বীপ অবস্থিত। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে রায়মঙ্গল নদীটির দুইপাশেই সুন্দরবন। সুন্দরবন প্লায়েস্টোসিন যুগ (২০ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ বছর আগে) ও তৎপরবর্তী হলোসীন যুগে (১ লক্ষ বছর থেকে অদ্যাবধি) উজান থেকে মিঠা পানির সাথে আসা পলির পতন এবং তার উপর সাগরের মোহনায় গজানো গাছপালার মাধ্যমে সৃস্টি হয়েছে। গড় সমুদ্র তল থেকে এর ভূমির উচ্চতা ০.৯ মিটার থেকে ২.১১ মিটার। প্রায় ১০,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত সুন্দরবনের ৬০% বাংলাদেশের ভিতরে পড়ে। বাংলাদেশের স্থলভূমি ৪,২০০ বর্গকিলোমিটার এবং নদী, খাল ও খাড়ি নিয়ে ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটার। অজস্র নদী- নালায় পরিপূর্ণ এখানকার জলাভূমি, কাদার তাল, ভাটায় জেগে ওঠা সাগরের ভেতরের জমি এখানে জলজ ও ভুমিজ প্রাণীর এক বিচিত্র সমাহার সৃষ্টি করেছে।

রায়মঙ্গল নদীটির মুখে মান্দারবাড়ী দ্বীপে বাংলাদেশ বন বিভাগের সুন্দরবন (পশ্চিম) বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রমটি অবস্থিত। এই অভয়াশ্রমটির মোট এলাকা ৭১৫ বর্গকিলোমিটার। নদীটি সুন্দরবনের অভ্যন্তরস্থ নৌচলাচল পথ হিসেবে নদীটি ব্যবহৃত হয়। নদীটি উপকূলীয় জোয়ার ভাঁটার নদী এবং এর পানি লবণাক্ত।

তথ্যসূত্র
১) বাংলাদেশের নদনদী- ম. ইনামুল হক। প্রথম জনান্তিক সংস্করণ (ফেব্রুয়ারি ২০২০)। পৃষ্ঠা ২৯, ৩০। আইএসবিএন: 984-781-197-X
২) রায়মঙ্গল নদী – উইকিপিডিয়া
৩) রায়মঙ্গল নদী -বাংলাপিডিয়া। ০৫ মে ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
৪) আন্তঃসীমান্ত নদী – বাংলাপিডিয়া। ১৬ জুন ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০।
৫) মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক (ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। বাংলাদেশের নদনদী: বর্তমান গতিপ্রকৃতি। ঢাকা: কথা প্রকাশ। পৃষ্ঠা ৭১। আইএসবিএন: 984-70120-0436-4
৬) Amirul Ashraf (২০১২)। “Satkhira District”। Sirajul Islam and Ahmed A. Jamal। Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh (দ্বিতীয় সংস্করণ)। Asiatic Society of Bangladesh। ২৮ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০।
৭) “The Sundarbans of India: a development analysis By Asim Kumar Mandal”। সংগ্রহের তারিখ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০।

আপনার মতমত দিন

Spread the love

goECO

We are the first generation to be aware of environmental conservation and we are the last to protect it. lets protect and conserve the earth together.

One thought on “রায়মঙ্গল নদী | Raimangal River

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *